এনআইডি হারালেই অনলাইনে পাবেন নতুন কার্ড, থানায় জিডির ঝামেলা শেষ

জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড হারিয়ে গেলে আগে নতুন কার্ড পাওয়ার জন্য নাগরিকদের থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হতো। এরপর জিডির কপিসহ নির্বাচন অফিসে অথবা অনলাইনে পুনরায় কার্ড ইস্যুর আবেদন করতে হতো। এতে সময়, অর্থ ও বাড়তি ভোগান্তির মুখে পড়তেন অনেকেই। তবে নাগরিকদের এই দুর্ভোগ কমাতে জিডি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে এনআইডি হারিয়ে গেলে এখন আর শুধু পুনরায় কার্ড পাওয়ার আবেদনের জন্য থানায় গিয়ে জিডি করার প্রয়োজন নেই।

নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। পরে ৯ সেপ্টেম্বর কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হারানো এনআইডির দ্বিতীয় কপি বা পুনঃইস্যু পেতে আগে জিডি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। নাগরিক সেবা সহজ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যেই সেই শর্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।

এর অর্থ, এনআইডি হারিয়ে গেলে নাগরিককে নতুন করে ভোটার নিবন্ধন করতে হবে না। আগের পরিচয় ও তথ্যের ভিত্তিতেই পুনরায় কার্ড পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে। তবে আবেদন যাচাই, নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের বিষয়গুলো আগের মতোই প্রযোজ্য থাকবে।

এনআইডি হারালে কোথায় আবেদন করবেন

হারানো জাতীয় পরিচয়পত্র পুনরায় পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত অনলাইন সেবা ব্যবহার করা যায়। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভিস পোর্টাল https://services.nidw.gov.bd/-তে প্রবেশ করতে হবে। এটি জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।

যাঁদের আগে থেকেই এই পোর্টালে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাঁরা নিজেদের অ্যাকাউন্টে লগইন করে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারবেন। আর যাঁদের অ্যাকাউন্ট নেই, তাঁদের প্রথমে নিবন্ধন বা অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ এবং পোর্টালে চাওয়া অন্যান্য তথ্য দিতে হতে পারে।

অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের জন্য মোবাইল নম্বরে ওটিপি পাঠানো হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচয় নিশ্চিত করতে মুখমণ্ডল যাচাই বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাইয়ের ধাপও থাকতে পারে। তাই আবেদন করার সময় নিজের সচল মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা এবং পোর্টালে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

অনলাইনে হারানো এনআইডির জন্য আবেদন করার নিয়ম

প্রথমে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের ব্রাউজার থেকে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। এরপর নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করতে হবে। অ্যাকাউন্ট না থাকলে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

লগইন করার পর পোর্টালে থাকা সেবাগুলোর মধ্য থেকে রিইস্যু বা পুনরায় ইস্যু-সংক্রান্ত অপশন নির্বাচন করতে হবে। এরপর কার্ড হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে আবেদনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। আবেদন ফরমে যে তথ্য চাওয়া হবে, সেগুলো জাতীয় পরিচয়পত্রের আগের তথ্যের সঙ্গে মিল রেখে পূরণ করতে হবে।

আবেদনের সময় এনআইডি নম্বর, ব্যক্তিগত তথ্য, যোগাযোগের তথ্য এবং হারানোর ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিবরণ চাওয়া হতে পারে। কোনো তথ্য না জানলে অনুমান করে পূরণ করা ঠিক হবে না। পোর্টালে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক তথ্য দিতে হবে।

এরপর আবেদনকারীর জন্য প্রযোজ্য পুনঃইস্যু ফি দেখানো হলে তা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে হবে। পোর্টালে যে পেমেন্ট মাধ্যম দেখানো হবে, সেটি ব্যবহার করাই নিরাপদ। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বিকাশ ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে এনআইডি ফি পরিশোধের নির্দেশনাও রয়েছে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে। আবেদন অনুমোদিত হলে পোর্টালে সংশ্লিষ্ট তথ্য হালনাগাদ হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মোবাইল নম্বর বা ইমেইলে বার্তা পাঠানো হতে পারে।

এনআইডি পুনঃইস্যুর জন্য কত টাকা ফি লাগে

হারানো বা নষ্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পুনরায় ইস্যুর ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি ফি দিতে হয়। তবে সবার জন্য একই অঙ্কের ফি প্রযোজ্য নাও হতে পারে। কার্ডটি কতবার পুনঃইস্যু করা হচ্ছে, সাধারণ নাকি জরুরি সেবা নেওয়া হচ্ছে এবং কার্যকর ফি তালিকায় কী নির্ধারণ করা হয়েছে—এসব বিষয়ের ওপর ফি নির্ভর করতে পারে।

এ কারণে পুরোনো কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দেওয়া উচিত নয়। আবেদন করার সময় নির্বাচন কমিশনের সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত ফি যাচাই করতে হবে। পেমেন্টের আগে আবেদনকারীর নাম, এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য এবং টাকার পরিমাণ মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

ফি পরিশোধের পর লেনদেনের রসিদ বা ট্রানজেকশন তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো কারণে আবেদনপ্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে এই তথ্য কাজে লাগতে পারে। সরকারি ফি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

আবেদন অনুমোদিত হলে অনলাইন কপি ডাউনলোড করবেন যেভাবে

হারানো এনআইডি পুনঃইস্যুর আবেদন অনুমোদিত হলে অনলাইন পোর্টালে সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। এ জন্য পুনরায় নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করে ডাউনলোড বা প্রিন্টের অপশন দেখতে হবে।

অনলাইন কপি ডাউনলোডের পর সেটি নিজের কম্পিউটার বা মোবাইলে নিরাপদে সংরক্ষণ করা উচিত। প্রয়োজনে প্রিন্ট করেও রাখা যায়। তবে অনলাইন কপি ডাউনলোড করা এবং নতুন স্মার্ট কার্ড হাতে পাওয়া এক বিষয় নয়। স্মার্ট কার্ডের মুদ্রণ, বিতরণ ও সংগ্রহের জন্য নির্বাচন কমিশনের আলাদা প্রক্রিয়া থাকতে পারে।

কোনো ব্যাংক, সরকারি দপ্তর বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অনলাইন কপি গ্রহণ করবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। তাই জরুরি কাজে এনআইডি প্রয়োজন হলে আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জেনে নেওয়া ভালো।

এনআইডি হারিয়ে গেলে কি থানায় একেবারেই জিডি করা যাবে না?

নির্বাচন কমিশন হারানো এনআইডি পুনঃইস্যুর আবেদনে জিডি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু দ্বিতীয় কপি পাওয়ার জন্য জিডি করতে হবে না। তবে কেউ যদি এনআইডি চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধের শিকার হন, তাহলে বিষয়টি পুলিশকে জানানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

কার্ড হারানোর পর সেটি অন্য কেউ অপব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা থাকলে নিজের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। বিশেষ করে এনআইডির কপি বা ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কারও হাতে চলে গেছে বলে মনে হলে সতর্ক থাকা জরুরি।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, জিডির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে বলে হারানো কার্ডের তথ্য যাচাই ছাড়াই যে কেউ নতুন কার্ড পেয়ে যাবেন, বিষয়টি এমন নয়। আবেদনকারীর পরিচয়, তথ্যের সঠিকতা এবং পুনঃইস্যুর যোগ্যতা নির্বাচন কমিশন যাচাই করতে পারে।

এনআইডি নম্বর মনে না থাকলে কী করবেন

অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কার্ডের নম্বরও মনে থাকে না। এ ক্ষেত্রে পুরোনো এনআইডির ফটোকপি, মোবাইলে সংরক্ষিত ছবি, ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া কাগজপত্র, পাসপোর্টের তথ্য কিংবা আগের কোনো আবেদনপত্র থেকে নম্বরটি খুঁজে দেখা যেতে পারে।

এনআইডি নম্বর বা প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে না পেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। নিজের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে নির্বাচন অফিস থেকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানা যাবে। অন্য কারও পরিচয় ব্যবহার করে বা অনুমানভিত্তিক তথ্য দিয়ে আবেদন করার চেষ্টা করা উচিত নয়।

হারানো ও নষ্ট এনআইডির আবেদন কি একই?

জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে গেলে এবং কার্ড হাতে থাকা অবস্থায় নষ্ট হয়ে গেলে উভয় ক্ষেত্রেই পুনঃইস্যুর প্রয়োজন হতে পারে। তবে আবেদনের কারণ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে আলাদা তথ্য বা নির্দেশনা থাকতে পারে।

কার্ড হারিয়ে গেলে সেটি আর আবেদনকারীর কাছে থাকে না। অন্যদিকে কার্ড ভেঙে গেলে, পুড়ে গেলে বা ব্যবহারের অনুপযোগী হলে সেটি আবেদনকারীর কাছে থাকতে পারে। নষ্ট কার্ডের ক্ষেত্রে পুরোনো কার্ড জমা দেওয়া বা দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় প্রকৃত কারণ নির্বাচন করতে হবে এবং পোর্টালের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

এনআইডি হারানোর পর যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যক্তির নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। তাই কার্ড হারানোর পর শুধু নতুন কার্ডের আবেদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনআইডির ছবি প্রকাশ করা উচিত নয়। অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এনআইডির নম্বর, জন্মতারিখ, ওটিপি কিংবা অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড দেওয়া যাবে না। অনলাইনে আবেদন করার সময় ঠিকানাটি নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইটের কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।

কেউ যদি ফোন করে এনআইডি পুনঃইস্যুর নামে ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা টাকা চান, তাহলে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ওয়েবসাইট বা প্রতারণামূলক লিংক ছড়ানো হতে পারে। তাই সার্চের ফলাফল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে পাওয়া অপরিচিত লিংকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া ঠিক নয়।

এনআইডি-সংক্রান্ত সমস্যায় কোথায় যোগাযোগ করবেন

অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে সমস্যা হলে অথবা রিইস্যুর অপশন খুঁজে না পেলে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টালের নির্দেশনা দেখতে হবে। প্রয়োজনে নিজ এলাকার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। আবেদন আটকে গেলে বা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেওয়া ভালো।

জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত সরকারি তথ্য ও সেবা পেতে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট https://nidw.gov.bd/ এবং এনআইডি সার্ভিস পোর্টাল https://services.nidw.gov.bd/ ব্যবহার করা উচিত। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন করানোর আগে তাদের পরিচয় ও বৈধতা যাচাই করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, এনআইডি হারিয়ে গেলে নাগরিকদের জন্য একটি বড় ভোগান্তি কমিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এখন শুধু পুনঃইস্যুর আবেদন করার জন্য থানায় গিয়ে জিডি করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আবেদন, ফি পরিশোধ, তথ্য যাচাই এবং কার্ড সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত নির্দেশনা মেনে আবেদন করলে হারানো জাতীয় পরিচয়পত্রের পরিবর্তে নতুন কপি পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *