মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে ট্রাম্পের শেষ দুই বছরে কী পরিবর্তন আসবে?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহির চাপ বাড়বে। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা ও ভেটো দেওয়ার অধিকার বহাল থাকবে। ফলে নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন রয়েছে। দুটি আসন শূন্য। অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিরোধী পক্ষের আসন ৪৭টি। দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটিতে অন্তত চারটি আসনের নিট ব্যবধান ঘুরিয়ে দিতে হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি দেখা গেলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এবং অর্থনীতি, শুল্কনীতি, অভিবাসন ও ইরান যুদ্ধের মতো বিষয়গুলো নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ২০২৭ সালে সরকারি অর্থায়ন ও জাতীয় ঋণসীমা বাড়ানো নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত, অভিবাসন নীতি, শুল্ক আরোপ এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারবেন তাঁরা। কমিটির নেতৃত্ব পাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তলব ও নথিপত্র চাওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে।

ডেমোক্র্যাটরা ৫ থেকে ২০টি আসনের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শুনানির উদ্যোগ নিতে পারবেন। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা কংগ্রেসের সমন উপেক্ষা করলে তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকলে ডেমোক্র্যাটদের অধিকাংশ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে যেতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, গর্ভপাতের অধিকার, আবাসন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্র নিয়ে কিছু বিল প্রতিনিধি পরিষদে পাস করলেও সেগুলো আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত থাকবে।

ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ২১ থেকে ৪০টির ব্যবধানে পৌঁছালে দলটির নেতৃত্বের রাজনৈতিক শক্তি আরও বাড়বে। নতুন ও প্রগতিশীল সদস্যদের চাপের কারণে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের দাবিও জোরালো হতে পারে। একই সঙ্গে শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধের মতো বিষয়ে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও নিজ দলের অবস্থানের বাইরে যেতে পারেন।

বড় ব্যবধানে জয় পেলে বাজেট ও ঋণসীমা নিয়ে আলোচনায় ডেমোক্র্যাটদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা থাকায় তাদের অধিকাংশ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হতে পারে।

সিনেটে ৫০-৫০ আসন হলে কী হবে?

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা জিতলেও সিনেটে দুই দলের আসন সমান হলে নিয়ন্ত্রণ থাকবে রিপাবলিকানদের হাতে। কারণ, সিনেটে সমান ভোট পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নির্ধারক ভোট দিতে পারবেন।

এ পরিস্থিতিতে পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান এবং নিজ দলের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে আগ্রহী মধ্যপন্থী রিপাবলিকানদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাজেট ও ঋণসীমা নিয়ে কোনো সমঝোতা করতে গেলে অল্প কয়েকজন সিনেটরের অবস্থানই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারে।

এতে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা বাড়বে। তবে ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্ধারক ভোটের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের মনোনীত ব্যক্তিদের সিনেটের অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ থাকবে। শুল্ক, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে।

দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় বিচারক, মন্ত্রিসভার সদস্য ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সিনেটে মাত্র দুই আসনের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও কমিটি ও অধিবেশনের কার্যসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন তাঁরা। ট্রাম্পের বিচার বিভাগীয় মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদন আটকে দেওয়া কিংবা সুপ্রিম কোর্টে কোনো পদ শূন্য হলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।

তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁদের সামনে বড় বাধা থাকবে। কারণ, সিনেটে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করতে ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। ফিলিবাস্টার নামের এই পদ্ধতিতে বিরোধী দলের সদস্যরা কোনো বিলের ওপর ভোট গ্রহণ বিলম্বিত বা আটকে দিতে পারেন। পাশাপাশি ট্রাম্প কোনো বিলের বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগ করতে পারবেন।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা চার থেকে ছয় আসনে পৌঁছালে দলটির নেতৃত্বের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। শুল্কনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার মতো বিষয়ে বিল পাসের উদ্যোগ নিতে পারবেন তাঁরা। এসব বিল ট্রাম্পের ভেটোর মুখে পড়লে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে আট বা তার বেশি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বাজেট ও ঋণসীমা নিয়ে আলোচনায় ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে এত বড় ব্যবধানে জয় পেলেও প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল, ফিলিবাস্টার অতিক্রম কিংবা অভিশংসন প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো পর্যাপ্ত ভোট তাঁদের হাতে থাকবে না।

দুই কক্ষেই রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে

নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই রিপাবলিকানরা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক সুবিধাজনক হবে। এতে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের আইনপ্রণেতারা নির্বাচনের ফলকে নতুন করে জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।

কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে বাধা কমবে। বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদন পাওয়ার পথও সহজ হবে। একই সঙ্গে বাজেট, সরকারি অর্থায়ন ও ঋণসীমা নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি তুলনামূলক কমতে পারে।

তবে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ পুরোপুরি দূর হবে না। বিশেষ করে ২০২৭ সালের বাজেট ও ঋণসীমা নিয়ে দুই দলের মধ্যে দরকষাকষি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক পরিবেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তদন্ত ও নজরদারি বাড়বে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে নিজের নীতিগুলো বাস্তবায়নে তুলনামূলক বেশি সুযোগ পাবেন ট্রাম্প। তবে যেকোনো পরিস্থিতিতেই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, ভেটো এবং কংগ্রেসের আইন প্রণয়নের সীমাবদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে থাকবে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *