এনআইডি সংশোধনে নতুন নিয়ম, লাগবে নিজের নামে নিবন্ধিত সিম

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সংশোধনের আবেদনে জালিয়াতি ঠেকাতে নতুন নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল সিম ছাড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যাবে না। এ ব্যবস্থা চালু করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে আলোচনা করছে সংস্থাটি।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল নম্বরের মালিকানা যাচাইয়ের জন্য বিটিআরসির সঙ্গে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আবেদনকারীর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি তাঁর নিজের নামে নিবন্ধিত কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে। আলোচনা শেষ হলে নতুন পদ্ধতি চালুর কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

সম্প্রতি মৃত এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদনকে কেন্দ্র করে ইসির তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা ও আবেদন যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত ২৫ আগস্ট এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ঢাকা মেইল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে মারা যাওয়া এক ব্যক্তি ২০২৬ সালে এসে নিজের এনআইডি সংশোধনের আবেদন করেছেন। এমনকি আবেদনটি মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ বা ফেস ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলী আকবর নামের ওই ব্যক্তির আবেদনে নিজের নাম সংশোধনের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসেবে জমা দেওয়া হয় মৃত্যু সনদ, নিজের নামে ওয়ারিশ সনদ, সন্তানের এনআইডি, শিক্ষা সনদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও পাসপোর্ট। তবে মৃত্যু সনদে উল্লেখ ছিল, তিনি ২০২০ সালের ৫ মার্চ মারা গেছেন। ফলে মৃত্যুর ছয় বছর পর তাঁর নামে কীভাবে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আবেদন করা হলো, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।

ইসি সূত্রের ভাষ্য, বর্তমানে একজন নাগরিক ফেস ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করতে পারেন। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রতারক চক্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়াই আবেদন করার চেষ্টা করছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে আবেদনকারীর পরিচয়ের পাশাপাশি মোবাইল নম্বরের মালিকানা যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সর্বোচ্চ আটটি এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা যায় বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়েই আবেদন করতে হবে। ফলে একটি নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার সুযোগ আর থাকবে না বলে ইসির পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন সোমবার (২ নভেম্বর) ঢাকা মেইলকে বলেন, বিটিআরসির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষ হলেই এনআইডি সংশোধনের আবেদনে নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহারের পদ্ধতি চালু করা হবে।

এদিকে এনআইডি নিবন্ধন ও সংশোধনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের উদ্যোগও নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য বিটিআরসিসহ মোট নয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিশন।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বিটিআরসি, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিভাগ।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা চালু হলে এনআইডি নিবন্ধন ও সংশোধনের জন্য জমা দেওয়া বিভিন্ন তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করা সহজ হবে। এতে আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে।

সাধারণ নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি পাওয়ার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ঠিকানার প্রমাণ, বাবা-মায়ের এনআইডি এবং বিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হতে পারে। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএন নম্বরও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জমা দিতে হয়।

প্রবাসী নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কাগজপত্র জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। তাঁদের অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্র, বাংলাদেশি পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, নির্ধারিত নাগরিকদের প্রত্যয়ন ও ছবি সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের নিবন্ধন কেন্দ্রে জমা দিতে হয়। প্রবাসীদের জন্য এনআইডি সংশোধনের নতুন পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন।

এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তিতে নির্বাচন কমিশন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী ছয়টি ক্যাটাগরি অনুসরণ করে। এগুলো হলো ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ। আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগটি এখনো বিটিআরসির সঙ্গে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। আলোচনা শেষ করে প্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন নিয়ম চালুর কথা জানিয়েছে ইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *