দেশে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ শতাংশ শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী ডা. এস এম জিয়া উদ্দিন হায়দার। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে গবেষণা, সচেতনতা এবং কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘Ensuring Quality Mental Health Services in Bangladesh’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ও বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি (বিসিপিএস)। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে এ আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. এস এম জিয়া উদ্দিন হায়দার বলেন, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কেবল লক্ষণ নয়, এর পেছনের মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। এ বিষয়ে গবেষণা বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার ফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বর্তমানে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে। মানুষ মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও অনেক সময় পাশের প্রতিবেশীর খোঁজ রাখে না। এ ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকর করতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নেতিবাচক ধারণা ও কুসংস্কার দূর করা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সবার জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শাহানূর হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উইনরক ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ দীপ্তা রক্ষিত। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. এম. কামরুজ্জামান মজুমদার। আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিনিয়র পাবলিক হেলথ অফিসার ড. হারুকা সাকামোতো। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন উইনরক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ম্যানেজার শেখ নাজমূল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।
উল্লেখ্য, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘Lived Experience Heard: Real Voices, Real Change’। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা ও সেবার অপ্রতুলতাকে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব বাধা দূর করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ ও বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি ১৯৯৭ সাল থেকে কাজ করছে।