৩০ বছর পর নিউইয়র্কে হামে শিশুর মৃত্যু, বাড়ছে সংক্রমণ

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে তিন দশকেরও বেশি সময় পর হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যটির লুইস কাউন্টিতে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে এই মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য বিভাগ। কয়েক দশক পর এমন মৃত্যুর ঘটনা রাজ্যজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় টিকাদান ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (২ নভেম্বর) নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে রাজ্যটিতে হামে মৃত্যুর এটিই প্রথম ঘটনা। তবে নিহত শিশুটির বয়স, পরিচয় কিংবা টিকা নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

লুইস কাউন্টিতে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নতুন সংক্রমণ শনাক্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া অন্যান্য কাউন্টিকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

গত মাসে নিউইয়র্ক ও আশপাশের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর গভর্নর ক্যাথি হচুল রাজ্যে দুর্যোগকালীন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং টিকাদান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়াই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

চলতি বছর নিউইয়র্কে হামের সংক্রমণের সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে ১৭৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জন নিউইয়র্ক সিটির বাইরের বাসিন্দা এবং আটজন শহরটির বাসিন্দা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করা এবং সংক্রমণের উৎস অনুসন্ধানে কাজ চলছে।

এ পরিস্থিতিতে যাঁরা এখনো হাম, মাম্পস ও রুবেলার (এমএমআর) টিকা নেননি, তাঁদের টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নিউইয়র্কের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিচ্ছে। মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের এক ইমেইল বিবৃতিতে রয়টার্সকে জানানো হয়েছে, রাজ্যের অনুরোধে সিডিসি মহামারিবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞকে মাঠপর্যায়ে পাঠিয়েছে। তাঁরা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে রোগ পর্যবেক্ষণ, সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ এবং নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণে কাজ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামের সংক্রমণ নতুন করে বেড়েছে। সিডিসির হিসাবে, চলতি বছর দেশটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে সংস্থাটি এসব মৃত্যুর রাজ্যভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

অন্যদিকে, চলতি বছর হামের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পেনসিলভানিয়া। সেখানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং এ রোগে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে রাজ্যভিত্তিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

হামে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সিডিসি ও বিভিন্ন রাজ্যের তথ্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এর পেছনে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ ও হিসাব করার পদ্ধতিতে পরিবর্তনকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের দায়িত্বকালে নীতিগত পরিবর্তনের পর সিডিসি হামজনিত মৃত্যুর হিসাব তৈরিতে রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের পরিবর্তে ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিস্টিকসের মৃত্যুসংক্রান্ত উপাত্ত ব্যবহার করছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের নির্ধারিত সময়ে এমএমআর টিকা দেওয়া হলে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিউইয়র্কে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তাই যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় টিকাদানের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *